ডিজিটাল যুগে বাংলা সিনেমার নতুন পরিচয় ২৫ বছরের প্রেক্ষাপট
ভূমিকা: ২৫ বছরে বাংলা সিনেমার বিশ্বযাত্রা
গত ২৫ বছরে (২০০০-২০২৫) বাংলা চলচ্চিত্র এক অসাধারণ যাত্রাপথের সাক্ষী হয়েছে। ডিজিটাল যুগের সূচনা শহরের গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি, পেশাগত চাপ এবং সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বাংলা সিনেমায় এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। এই সময়ে, বাংলা সিনেমা তার নিজস্ব পরিচয়কে ‘আঞ্চলিক’ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ‘জাতীয়’ এবং পরিশেষে ‘বৈশ্বিক’ মঞ্চে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই রূপান্তর শুধু প্রযুক্তিগত বিবর্তন নয়, বরং শিল্প, নান্দনিকতা ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও এক গভীর পরিবর্তন এনেছে।
সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল: এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন
সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তন কেবল কারিগরি উৎকর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সিনেমা নির্মাণের ভাষা, নান্দনিকতা এবং ব্যবসার ধরনও আমূল বদলে দিয়েছে।
একসময় সেলুলয়েড যুগের ধ্রুপদী আভিজাত্য ছিল। শুটিংয়ের সময় লেন্সের মধ্য দিয়ে যা দেখা যেত, তার উপর একমাত্র নিয়ন্ত্রণ থাকত সিনেমাটোগ্রাফার বা ক্যামেরাম্যানের। ল্যাব থেকে প্রিন্ট হাতে না আসা পর্যন্ত পরিচালক বা অভিনেতা কেউই জানতেন না, ঠিক কী শুট হয়েছে। ক্যামেরাম্যানই ছিলেন সিনেমার ‘প্রথম একক দর্শক’। সেই যুগে সিনেমার এক ধরনের ‘অনিশ্চয়তার সৌন্দর্য’ ছিল।
ডিজিটাল যুগে তা রূপান্তরিত হয়েছে ‘নিশ্চিত ও নিখুঁত’ নির্মাণে। ‘ডিআই’ (ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট) এবং গ্রাফিক্স এখন ছবিকে আরও রঙিন ও ঝকঝকে করে তুলেছে, যদিও সেলুলয়েডের সেই গভীরতা এখনও অনেক সিনেমাপ্রেমীর কাছে এক অপার্থিব নস্টালজিয়া। সেলুলয়েডে ব্যয়বহুল ফিল্ম নষ্ট হওয়ার আতঙ্ক থেকে বর্তমান সিনেমাজগৎ সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। আগে এডিটিং ছিল কায়িক শ্রমের কাজ, যেখানে ফিল্মের ফ্রেম কেটে সিমেন্ট আঠা দিয়ে জোড়া হত। এখন কম্পিউটার সফটওয়্যার অত্যন্ত দ্রুত সেই কাজ সম্পন্ন করে। ‘স্পেশাল এফেক্ট’ বা ‘ভিএফএক্স’-এর ব্যবহার এখন বাংলা সিনেমায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ, তরুণ ও স্বাধীন চিত্রনির্মাতারা কম বাজেটে সিনেমা বানানোর সাহস নিয়ে এগিয়ে আসছেন।
সিনেমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বড় পরিবর্তন। আগে ভারী ভারী রিলের বাক্স একটি সিনেমা হল থেকে অন্য হলে পাঠাতে হত, যেখানে প্রিন্টে সামান্য ত্রুটিও স্ক্রিনে ফুটে উঠত। এখন সার্ভারের মাধ্যমে হলে সিনেমা পাঠানো হয়, যার ফলে ছবি এখন ঝকঝকে এবং ত্রুটিমুক্ত। তবে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে অনেক পুরনো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ডিজিটাল রূপান্তর বাংলা সিনেমার জন্য একাধারে আশীর্বাদ এবং বড় চ্যালেঞ্জ উভয়ই এনেছে। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা আমাদের সিনেমাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিলেও, সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
২০০০ সালের দশক: সংকট ও নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন
১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক বাংলা সিনেমার ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে সেই বাংলা সিনেমায় মানহীন ও নকল চলচ্চিত্রের নির্মাণ বেড়ে যায়। সে সময় অনেক প্রযোজক ও পরিচালক মনে করতেন, বাংলা মেজাজ, ঐতিহ্য বা বাঙালিয়ানাকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরি করলে তা জনপ্রিয় হবে না। ‘দর্শকের চাহিদা বদলেছে’ এই অজুহাতে হাই বাজেট, বিদেশের মাটিতে নায়ক-নায়িকার উদ্দাম নৃত্য, এবং অপ্রয়োজনীয় মারদাঙ্গাকে ‘নতুন স্বাদ’ বলে দর্শকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের সস্তা মোহ সাময়িকভাবে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের হলমুখী করলেও, মধ্যবিত্ত খাঁটি বাঙালি দর্শকদের হলবিমুখ করে তোলে। তারা তাদের বিকল্প বিনোদন টেলিভিশনে খুঁজে পায়। ভিনভাষার অতিনাটকীয় ও অশ্লীলতা-নির্ভর কনটেন্ট দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যে ধ্বংসের বীজ বপন করা হয়েছিল, ইন্ডাস্ট্রি তার ফল এখনও ভোগ করে চলেছে। প্রমাণস্বরূপ, তখন রাজ্যে মোট সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৪০০-রও বেশি, যা এখন মাল্টিপ্লেক্স-সহ প্রায় ১২০-তে এসে ঠেকেছে। গণহারে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার ধারাবাহিকতায় সিনেমা নির্মাণের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
তবে এই সংকটের মাঝেই নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন কিছু নির্মাতা। ২০০০ সালের দশকে বাংলা সিনেমায় ‘কমার্শিয়াল’ এবং বিকল্প, নান্দনিক, ও মধ্যবর্তী সিনেমার মধ্যে ভাঙন শুরু হয়। কিছু নির্মাতা নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন দর্শক, নতুন স্বপ্ন এবং নতুন কনটেন্ট নিয়ে এগিয়ে আসেন। এই সময়ে বেশ কিছু সিনেমা বাণিজ্যিক ‘হিট’ না হলেও, চলচ্চিত্রীয় দৃষ্টিকোণ, সামাজিক বা মানসিক গভীরতার নতুন ভাবনার মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবী দর্শকদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল।
নক্ষত্রদের উত্থান: ফিরে আসা আত্মবিশ্বাস
এই মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলা সিনেমার নতুন আত্মবিশ্বাসের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তার পরিচালিত ‘উৎসব’ (২০০০), ‘চোখের বালি’ (২০০৩), ‘রেনকোট’ (২০০৪), ‘দোসর’ (২০০৬), ‘আবহমান’ (২০১০)-এর মতো ছবিগুলো সম্পর্ক, স্মৃতি ও অন্তর্জগতের নান্দনিকতা ফিরিয়ে এনে বাংলা সিনেমার ‘সংস্কৃতিমূল্য’ পুনর্স্থাপিত করে।
দীর্ঘ বিরতির পর বর্ষীয়ান পরিচালক তরুণ মজুমদার ২০০১ সালে ‘আলো’ ছবির প্রস্তুতি শুরু করেন, যা ২০০৩ সালে মুক্তি পায়। তার এই সক্রিয়তা বাংলা সিনেমার সুস্থ ধারার দর্শকদের আশাবাদী করে তোলে। গৌতম ঘোষের ‘দেখা’ (২০০১) বাংলা চলচ্চিত্র-ইতিহাসে শুধু শৈল্পিক সৃষ্টি হিসাবে নয়, বরং কারিগরি বিপ্লব হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই সিনেমার হাত ধরেই বাংলা সিনেমা হলে প্রথম প্রবেশ ঘটেছিল ‘ডলবি ডিজিটাল’ (Dolby SR) শব্দ প্রযুক্তির। সুতরাং, এই অর্থে বলা যেতেই পারে যে বাংলা সিনেমায় ডিজিটাল রূপান্তরের প্রথম সোপানটি তৈরি হয়েছিল শব্দের মাধ্যমে।
নবারুণ ভট্টাচার্যর উপন্যাস অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায় প্রথম ছবি ‘হারবার্ট’ (২০০৫) নির্মাণ করেন। সুমন এই ছবিতে কলকাতার নগরজীবন, মৃত্যু এবং সামাজিক রাজনৈতিক ভাষ্যকে ‘ডার্ক কমেডি’ এবং মর্মস্পর্শী বাস্তবতার সঙ্গে অন্বেষণ করেন, যা পোস্টমডার্ন বাংলা সিনেমার মাইলফলক। অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর ‘অনুরণন’ (২০০৬) এবং ‘অন্তহীন’ (২০০৯) বাংলা সিনেমায় এক নতুন পথ দেখিয়েছে যে, ভালো সিনেমা মানেই জটিল বা দুর্বোধ্য কিছু নয়। কারিগরি উৎকর্ষ এবং মনোগ্রাহী সংগীত থাকলে গভীর বিষয়ের সিনেমাও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। পরিচালক সুমন ঘোষের ছবি ‘পদক্ষেপ’ (২০০৬) সিনেমা গল্প এবং অভিনয়ের মিশ্রণে ভীষণভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ছবিতে অভিনয়সূত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ৫০ বছরের সুদীর্ঘ অভিনয়-জীবনে প্রথমবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।
একই সময়ে বাংলা সিনেমা দর্শকদের অন্য ধারার ছবি উপহার দেন অঞ্জন দত্ত। আধুনিক নব্য বাঙালির জীবন, বিভ্রান্তি, দূরত্ব, সম্পর্ক, পরিবার, বন্ধুত্ব, পেশা সবকিছুর এক আন্তঃসম্পর্কিত ছবি ছিল ‘দ্য বং কানেকশন’ (২০০৭)। আবার সংস্কৃতি ও বাস্তবজীবনের দূরত্ব নিয়ে লো-কি, মুডি, নস্টালজিক স্টোরিটেলিংয়ে এক প্রজন্মের হারানো সময়ের ডায়েরি অঞ্জন দত্তের ‘ম্যাডলি বাঙালি’ (২০০৯)। সংবেদনশীল, সাহিত্যমনস্ক, নারীকেন্দ্রিক, কাব্যিক সিনেমার ধারক অপর্ণা সেনের ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’। এই ছবিতে অপর্ণা সেন দূরত্ব-নির্ভর প্রেমের নবরূপকার। তার সৃষ্ট প্রেমে শারীরিক উপস্থিতি বা মিলনদৃশ্য নেই, আছে শুধু চিঠি, উপহার আর অনুপস্থিতির তীব্র আকুলতা। অন্যদিকে ‘মনের মানুষ’-এ গৌতম ঘোষের হাত ধরে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন উঠে আসে। অপর্ণা সেন যেখানে প্রেমের ‘অনুপস্থিতি’-কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন, সেখানে গৌতম ঘোষ লালনের মাধ্যমে মানুষের ‘অন্তরাত্মা’-র জয়গান গেয়েছেন। এই দুই ছবিই প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির আধুনিকতার পাশাপাশি বাংলা সিনেমার আসল শক্তি তার সাহিত্যমনস্কতা ও গভীর জীবনবোধ।
এই দশকের পরিশেষে এ কথা বলা যেতে পারে যে জিৎ, দেব, কোয়েলের মতো ‘নতুন মুখ’-এর উত্থানের প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল, অন্যদিকে সমান্তরাল বাংলা সিনেমা জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে পরিচালকই হয়ে ওঠেন ছবির ব্র্যান্ড।
২০১০-২০২০: বিকল্প ধারার বিস্ফোরণ ও নব্য-শহুরে সিনেমার উত্থান
২০১০-এর দশক বাংলা সিনেমার জন্য ছিল ‘পরিবর্তন ও পুনরুদ্ধার’-এর সন্ধিক্ষণ। পুরনো ‘সোনালি যুগ’ পেরিয়ে নতুন ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফির আগমন হয়। যদিও ‘নীল নির্জনে’ (২০০৩) ছবিতে ডিজিটাল মাধ্যম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হয়েছিল, তবে ২০১০ সালে ‘বাই বাই ব্যাংকক’ ছবিতে প্রথম ‘রেড ক্যামেরা’ ব্যবহৃত হয় এবং সেই ছবির সাফল্য থেকেই বাংলা সিনেমায় ডিজিটাল মাধ্যম ক্রমশ তার দখল নেয়। ফলে স্বাধীন প্রযোজকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন অভিনেতা ও পরিচালকের আবির্ভাবে বাংলা ছবির পরিস্থিতিতে বহুমুখী রূপান্তর ঘটে।
এই প্রসঙ্গে সর্ব প্রথম উল্লেখ করতে হয় পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নাম। তার ‘অটোগ্রাফ’ (২০১০), ‘বাইশে শ্রাবণ’ (২০১১), ‘হেমলক সোসাইটি’ (২০১২)-এর মতো ছবিগুলো আধুনিক শহুরে গল্প, ডার্ক হিউমার, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপে ও নির্মাণ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। তার চলচ্চিত্রে থ্রিলার এবং নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ গল্প বলার ধরনে বাঙালি দর্শকের বয়স এবং রুচিতে বড় পরিবর্তন ঘটায়, ফলে নতুন একদল শিক্ষিত তরুণ দর্শক হলমুখী হয়। ব্যঙ্গ, কমেডি, স্যাটায়ারের এক অসাধারণ মিশ্রণ বাংলা সিনেমাকে নতুন ধারায় নিয়ে যান পরিচালক অনীক দত্ত। তার ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ (২০১২) তথাকথিত স্টারবিহীন কম বাজেটে বিশাল জনপ্রিয়তা পেয়ে বাংলা কমার্শিয়াল ছবির ধারণা বদলে দেয়।
আধুনিকতার সঙ্গে লোকগল্পের ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমসাময়িক বাংলা সিনেমার ভাষা নিয়ে যারা অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন, তাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী সংযোজন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। তারও অসম্ভব স্বল্প পুঁজির সফল ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ (২০১৩)। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় তার ‘শব্দ’ (২০১৩) নিয়ে। এই ছবিতে সিনেমার নেপথ্যে শব্দ পরিকল্পনা ও শব্দ সৃষ্টির এক কারিগরের জীবিকার কথা বলেছেন তিনি। আবার ‘সিনেমাওয়ালা’ (২০১৬)-তে সিঙ্গল স্ক্রিনের মৃত্যু নিয়ে ব্যথাতুর মর্মস্পর্শী গল্পও তিনি বলেছেন। ‘নগরকীর্তন’ (২০১৯) ছবিতে তিনি ‘এলজিবিটিকিউ+’ (LGBTQ+) এর মতো বিষয়টাকেও গভীর মানবিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
‘আসা যাওয়ার মাঝে’ (২০১৪) আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তর পরিচালনায় পরীক্ষামূলক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবি প্রথম প্রদর্শিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে যাবতীয় স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা সিনেমার মর্যাদা আদায় করে নেয়।
মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সিনেমা – কিন্তু ভয় বা বিষাদের দৃষ্টিতে নয়, বরং হাস্যরস, দার্শনিক ভাবনা এবং বন্ধুত্বের অদ্ভুত উষ্ণতার ছবি ‘পিস হেভেন’ (২০১৬)। ব্যঙ্গধর্মী ছবিটি পরিচালক সুমন ঘোষের একাধারে ব্যতিক্রমী এবং অন্যদিকে গভীরভাবে মানবিক। আধুনিক বাংলা রোম্যান্টিক ড্রামা ও পারিবারিক বিনোদনধর্মী মেনস্ট্রিম সিনেমার ‘ট্রেন্ডসেটার’ হিসাবে রাজ চক্রবর্তী এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাংলা রহস্য-গোয়েন্দা থ্রিলার ছবির মাধ্যমে অরিন্দম শীল বাংলা সিনেমায় এক বলিষ্ঠ সংযোজন। একই সঙ্গে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়ের জুটি ‘বেলাশেষে’ (২০১৫), ‘প্রাক্তন’ (২০১৬)-এর মতো ছবিগুলোতে আবেগঘন পারিবারিক ন্যারেটিভের সাহায্যে মধ্যবয়সি দাম্পত্য, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলন ফুটিয়ে তোলেন। অসাধারণ মানবিক গল্পের দরুন সর্বজনীন দর্শকশ্রেণীর উপস্থিতিতে তাদের ছবি বাংলা সিনেমার নতুন বাজার তৈরি করে। ‘ওটিটি’ (Over-The-Top) পূর্ব যুগে প্রেক্ষাগৃহে সবথেকে বড় সাফল্য এই জুটির। এই ধারা ২০২০-এর পর বাণিজ্যিক সিনেমা পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সেক্ষেত্রে এই ছবিগুলো বাংলা সিনেমাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আঙিনায় প্রতিনিধিত্ব করে।
২০২০ থেকে বর্তমান: ওটিটি এবং নতুন প্রজন্মের উত্থান
২০২০ সাল থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের আগমন এবং নতুন প্রজন্মের চিত্রনির্মাতাদের উত্থান বাংলা সিনেমাকে আরও বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। এটি আগামী দশকের নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহের দর্শক এবং ওটিটি দর্শক – এই দুটি আলাদা জনরুচি তৈরি হয়েছে, যার ফলে আশ্চর্যরকমভাবে আধুনিক সিনেমার গল্প, গতি, চরিত্র নির্মাণ সবক্ষেত্রে ওটিটি-র প্রত্যক্ষ প্রভাব ভীষণভাবে লক্ষণীয়।
পরিচালক অভিজিৎ সেনের ‘প্রজাপতি’ (২০২২) বাণিজ্যিক বাংলা ছবিকে পরিবারকেন্দ্রিক আবেগ দিয়ে আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনে। সাম্প্রতিক বাংলার সবচেয়ে বেশি আয় করা ছবির মধ্যে এই ছবি উল্লেখযোগ্য। বন্ধুত্ব, সরলতা, গ্রামীণ জীবন এবং সাম্প্রদায়িকতার সূক্ষ্ম সংঘাত দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বালকের গভীর বন্ধুত্ব নিয়ে নির্মিত ছবি ‘দোস্তোজি’ (২০২২)। পরিচালক প্রসূন চট্টোপাধ্যায়ের এই ছবি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভাণ্ডার। ২০২৫ সালেও সেই ধারা বজায় রেখেছে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ এবং প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘নধরের ভেলা’।
মূল উপলব্ধি
২০০০ থেকে ২০২৫ সালের এই সময়কাল বাংলা সিনেমাকে নতুন শিল্পভাষা, প্রযুক্তি, দর্শক সংস্কৃতি ও বয়ান দিয়েই পুনর্গঠিত করেছে। বাণিজ্যিক ধারা এবং নান্দনিক ধারা – এই দুই ধারাতেই সমান্তরালভাবে বাংলা সিনেমা এগিয়ে চলেছে। আকর্ষণীয় বিষয় হল, কোনো একটি ধারা অপর ধারাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ডিজিটাল যুগে শহরের গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি, পেশাগত চাপ, সম্পর্কের জটিলতা বাংলা সিনেমায় এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করা সত্ত্বেও, গত ২৫ বছরে বাংলা সিনেমা নিজের পরিচয়কে ‘আঞ্চলিক’ থেকে ‘জাতীয়’ আবার ‘বৈশ্বিক’ – এই তিন ফ্রেমেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলা সিনেমা এখন এক রূপান্তরময় সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে এবং ভবিষ্যতের আরও বহু সম্ভাবনা বহন করে চলেছে। এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত অহংকার ও অতিরঞ্জিত প্রচার দূরে সরিয়ে বাংলা সিনেমার আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ঘটিয়ে নতুন পথের সন্ধান করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সিনেমার পুনরুত্থান সম্ভব। শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য – এই তিনটি বিষয় যদি সমানভাবে বাংলা সিনেমার স্বার্থে একত্রিত হয়, তাহলেই আগামী দিনে এর পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনেক পরিচালক ও সিনেমার নাম হয়তো অনুল্লিখিত রয়ে গেল। তবে তাদের অনুপস্থিতি মানেই যে বাংলা সিনেমার পুনরুজ্জীবনের প্রয়াসে তাদের অবদান নেই, এমন ধরে নিলে তা অতি সরলীকরণের দোষ হবে।
